
মো: সালমান ফারসী,ডেমরা(ঢাকা)নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাউল সমাজ একটি সঙ্গীত-আশ্রয়ী সাধনা-ভজন সম্প্রদায়, যারা প্রচলিত ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পরিহার করে জীবনের মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় হিসেবে এই সাধনাকে গ্রহণ করে। বাউলদের লক্ষ্য হলো এক স্বতন্ত্র ধর্মবোধ ও সাধনামার্গের মাধ্যমে ‘অচিন মানুষ’ বা ‘মনের মানুষ’-কে খুঁজে পাওয়া। এই সাধনা মূলত যুগল সাধনা।
বাউলদের দর্শনে নারী হলেন এই সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ এবং পুরুষ সাধকের সিদ্ধি লাভের চাবিকাঠি। বাউল সাধনা প্রধানত তন্ত্র ও যোগ নির্ভর দেহতাাত্ত্বিক সাধনা । বাউলরা মানবদেহকে মসজিদ বা মন্দির তুল্য মনে করেন। এই সাধনার মূল উদ্দেশ্য হল দেহের সারবস্তু বীর্য বা বিন্দু রক্ষা করা, যাকে তারা ‘গুরুবস্তু’, ‘পুঁজি’ বা মানবদেহের ‘চালিকা শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিন্দু রক্ষা করাকে অটল সাধনা বলা হয়। এই সাধনার মাধ্যমে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পায় এবং রোগমুক্ত থাকা যায়। সাধনায় সফল হতে সাধকরা বিশেষ কৌশলে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে রতিকে ঊর্ধ্বগামী করেন, যাতে রতি (বীর্য) স্খলন না হয়। এই সাধনার জন্য সাধকরা মূত্র, রজঃ এবং বীর্যকেও বিনা দ্বিধায় ভক্ষণ করে থাকেন। ঋতুস্রাবের প্রথম তিন দিনকে সাধকরা মহাযোগের কাল বলে মনে করেন, যখন ‘সাঁই’ (ঈশ্বর)-কে মাছের মতো ধরা যায়।
বাউল শব্দের উৎস নিয়ে গবেষক ড. আনোয়ারুল করিম উল্লেখ করেন যে, প্রাচীন প্যালেস্টাইনের পৌত্তলিক প্রজনন-দেবতা বা’আল-এর উপাসনা থেকেই ‘বাউল’ শব্দটির উৎপত্তি। তাঁর মতে বা’আল উপাসনায় যৌনাচার ধর্মীয় আচারের অংশ ছিল; পরবর্তীতে ইসলাম-প্রভাবিত অঞ্চলে এই পৌত্তলিকতা, তন্ত্র, যোগ এবং সুফীবাদ মিলেমিশে এক ধরনের লোকধর্ম তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে বাউল ধর্মমত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তাঁর ভাষ্য মতে, বাউল শব্দটি এসেছে— বা’আল → বাওল → বাউল।
অন্যদিকে, ড. আহমদ শরীফ তাঁর “বাউলতত্ত্ব” গ্রন্থে বলেন যে বাউল মতের শিকড় রয়েছে ব্রাহ্মণ্য, শৈব ও বৌদ্ধ সহজিয়া তত্ত্বের মিশ্রণে গঠিত নাথপন্থে। পরে এ সম্প্রদায়ের লোকেরা ইসলাম বা বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিলেও মূল দেহতাত্ত্বিক সাধনা, তন্ত্র, যোগ ও কামযোগ বাদ দিতে পারেনি। ফলে হিন্দু-মুসলমান মিশ্রিত এক নতুন লোকধর্মের জন্ম হয়, যা শরিয়ত বা ব্রাহ্মণ্য বিধান—উভয়কেই উপেক্ষা করে স্বেচ্ছাচারী এক জীবনদর্শন অনুসরণ করে। এরা বলে— “কালী কৃষ্ণ গড খোদা—কোন নামে নাহি বাধা।”
বাউলরা নিজেদের ‘নাড়ার ফকির’ বলে পরিচয় দেয়—অর্থাৎ যাঁদের সন্তান জন্ম হয় না। তাঁরা হিন্দু-মুসলমান পরিচয় মানে না। তাদের গুরু বা সাঁইকেই দেবতুল্য মেনে চলে। লালন শাহকে তাঁরা নবীর মর্যাদায় দেখে; এমনকি একদল বাউল অভিযোগ করে বলেছিল—“আমরা আলাদা জাতি; আমাদের কালেমা—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ লালন রাসুলুল্লাহ।” বাউলদের কাছে গুরুর মৃত্যু নেই; তিনি কেবল দেহ ত্যাগ করেন।
ইসলামি আচার—নামাজ, রোজা, ঈদ, জুম্মা—কিছুই তারা মানে না; হিন্দু মন্দির বা মুসলিম মসজিদ, কোনো ধর্মীয় কেন্দ্রেই তারা যায় না। তাঁদের স্ত্রীরূপী সাধনসঙ্গিনীকে ‘জায়নামাজ’ বলা হয় এবং দেহতত্ত্ব বা যৌনযোগ তাদের সাধনার মূল অংশ। ড. আহমদ শরীফ উল্লেখ করেন, বাউল সাধনা মূলত কামযোগ ও যৌনাচারনির্ভর, যেখানে পরকীয়াকে সাধনার অংশ মনে করা হয়। বিভিন্ন কুসংস্কার—যেমন রজঃপান, বীর্য-মূত্র-মল মিশ্রণে “প্রেমভাজা” তৈরি ও ভক্ষণ, রোগমুক্তির জন্য মূত্রপান—এসব বিকৃত প্রথাও তাদের মধ্যে প্রচলিত। অনেক বাউলের একাধিক কমবয়সী সেবাদাসী থাকে।
লোকচক্ষুর আড়ালে দুর্বৃত্ত যৌনাচার লুকাতে অনেক বাউল তাঁদের গানে আরবি শব্দ, সুফী পরিভাষা ও ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করেছেন। উদাহরণ হিসেবে জনপ্রিয় গান “বাড়ির পাশে আরশি নগর”—যা সাধারণত আধ্যাত্মিক বলে মনে হলেও আসলে তা দেহতাত্ত্বিক ও যৌন প্রতীকে রচিত।
ইসলামের দৃষ্টিতে এই বাউল লোকধর্ম পূর্ণাঙ্গভাবে বিপরীত—পৌত্তলিক বিশ্বাস, ধর্মহীনতা, বিধিবর্জন, বিকৃত যৌনাচার ও কুসংস্কারে পরিপূর্ণ। এ কারণে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে মৌলভী রেয়াজউদ্দীন আহমদ “বাউল ধ্বংস ফতওয়া” রচনা করেন, যেখানে সমাজে বাউলদের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।
বাউল মতবাদ মুসলিম সমাজের কৃষ্টি-সংস্কৃতি বা আধ্যাত্মিক পরিচয়ের অংশ হতে পারে না।বাউলতত্ত্বের মূলে নারীর দেহতাত্ত্বিক সাধনা ও কামযোগ। নারীকে ব্যবহার করে দেহ সাধনায় সিদ্ধিলাভ করাই বাউলদের ধর্ম বিশ্বাস।

