বাড়িচট্টগ্রাম বিভাগচট্টগ্রাম জেলাচন্দ্র মাস নির্ধারণে বিভ্রান্তি: ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ দাবি

চন্দ্র মাস নির্ধারণে বিভ্রান্তি: ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ দাবি

চন্দনাইশ নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলাদেশে চন্দ্র মাস গণনার ক্ষেত্রে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি কুরআন, সুন্নাহ, ফিকহ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক নির্দেশনা অনুসরণ করছে না—এমন অভিযোগ তুলে সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন “চান্দ্র মাসের সঠিক তারিখ বাস্তবায়ন কমিটি” ও জাহাঁগিরিয়া শাহ্সুফি মমতাজিয়া দরবার শরীফ।
সোমবার (৯ মার্চ ২০২৬) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের তৃতীয় তলায় আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, চন্দ্র মাস গণনায় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় বাংলাদেশের কোটি কোটি মুসলমান ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল ও ইবাদত সঠিক সময়ে পালন করতে পারছেন না।
বক্তারা অভিযোগ করেন, জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি কুরআন-সুন্নাহ, ফিকহি সিদ্ধান্ত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রতি মাসে প্রকাশিত নতুন চাঁদের স্থানাংক বিবেচনায় না নেওয়ায় বিভিন্ন ধর্মীয় আমলে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে অনেক মুসলমান রমজানের প্রথম রোজা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তারা দাবি করেন। একইভাবে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনকে রমজানের শেষ দিন মনে করে কেউ কেউ ঈদের দিন রোজা রাখার পরিস্থিতিতে পড়ছেন বলেও উল্লেখ করেন বক্তারা।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়াওমুন আরাফার দিন নির্ধারণেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। ফলে হজের দিনের গুরুত্বপূর্ণ নফল রোজা অনেক সময় কুরবানির ঈদের দিন পালনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, অথচ শরীয়ত অনুযায়ী দুই ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। এছাড়া ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সালাত একদিন পরে আদায় করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মুসল্লিরা ওয়াজিব তরকের আশঙ্কায় পড়ছেন বলে দাবি করা হয়।
বক্তারা আরও বলেন, তাশরীকের ওয়াজিব তাকবীর একদিন পরে শুরু হওয়ায় প্রথম দিনের পাঁচটি ওয়াজিব তাকবীর আদায় থেকে মুসল্লিরা বঞ্চিত হচ্ছেন। একইভাবে শবে কদর, শবে বরাত, আশুরা এবং প্রতি মাসে আইয়ামে বীযের নফল রোজা সঠিক তারিখে পালন করা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা দাবি করেন, পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা (১৮৫ ও ১৮৯), সূরা তাওবা (৩৬), সূরা আর রহমান (৫) ও সূরা ইউনুস (৫) আয়াত, সহিহ বুখারি শরীফের ১৯০৯ নম্বর হাদিস এবং সহিহ মুসলিম শরীফের ১০৮১ নম্বর হাদিসসহ দীর্ঘদিনের ফিকহি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চাঁদ দেখার বিধান নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া প্রায় সাড়ে ১৩শ বছরের হানাফি, হাম্বলি ও মালেকি মাযহাবের আলেমদের সিদ্ধান্তের আলোকে ১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে জর্ডানের আম্মানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফিকহ সম্মেলনে বিশ্বের শতাধিক শরীয়াহ বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে ওআইসি’র ফিকহ একাডেমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো একটি দেশে নতুন চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে অন্য মুসলিম দেশগুলোও তা গ্রহণ করতে পারে এবং রোজা শুরু ও শেষ করার বিধান সার্বজনীন। পাশাপাশি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব ও পর্যবেক্ষণকে সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টিও অনুমোদন দেওয়া হয়।
কিন্তু বক্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি এসব শরীয়াহ ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা অনুসরণ না করে দীর্ঘদিন ধরে অলিখিতভাবে সৌদি আরবের একদিন পরে চন্দ্র মাস শুরু করার প্রথা অনুসরণ করে আসছে।
এ বিষয়ে সমাধানের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি ও ২ ফেব্রুয়ারি চান্দ্র মাসের সঠিক তারিখ বাস্তবায়ন কমিটির সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশন তথা জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে সেই আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আব্দুল্লাহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, কোভিড-১৯ মহামারি এবং সভাপতির ইন্তেকালের কারণে বিষয়টির চূড়ান্ত সমাধান আর সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট কমিটির মধ্যে অসমাপ্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা পুনরায় সম্পন্ন করে জাতীয় গুরুত্বের এই সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবি জানান বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ও ওআইসি ফিকহ একাডেমির সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মুফতি মাওলানা ড. সাইয়্যিদ আবদুল্লাহ আল-মারুফ আল-মাদানি আল-আযহারী, মুফতি ড. নজরুল ইসলাম আল-মারুফ, সাবেক মন্ত্রী এম নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, মাওলানা মুফতি ড. আবুল ফয়েজ মো. নাজিম উদ্দীন, শাহজাদা মাওলানা মুফতি মনজুর আলী, শাহজাদা মাওলানা মতি মিয়া মনসুর আলী, শাহজাদা মাওলানা মুফতি আহসান আলীসহ দেশের বিভিন্ন দরবার শরীফ, মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আলেম-উলামা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সাইয়্যিদ শাহ নূরে আহমদ মোর্শেদ আলো শাহ, কর্ণেল (অব.) আশরাফ আদ দীন, মির্জা আজম, অ্যাডভোকেট মাওলানা ড. মো. রাশীদুল হাসান, মুফতি মুহাম্মদ জাকারিয়া চৌধুরী, মুফতি ইকবাল হোসেন মজুমদার, মুফতি শাইখ শফিকুল ইসলাম, মাওলানা মুহাম্মদ আকতার ফারুকসহ আরও অনেক দেশবরেণ্য আলেম ও বিশিষ্টজন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মাওলানা শাহাবুদ্দিন আহমেদ।
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments