
আলি হোসেন ,বিশেষ প্রতিনিধি,চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) অবিলম্বে বাতিল করে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক গ্রিন গ্রিডে রূপান্তরের দাবিতে চাপাইনবাবগঞ্জে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন।
রবিবার (২৫ জানুয়ারি) সকালে চাপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শান্তির মোর এলাকায় স্থানীয় এনজিও পরিবর্তন–এর উদ্যোগে এবং চাপাইনবাবগঞ্জ পরিবেশ ফোরাম, পরিবেশ ও উন্নয়ন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এর সহ-আয়োজনে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) কোনো জনশুনানি, স্বচ্ছ পরামর্শ বা নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে। তাদের মতে, পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় পরিবেশ, সামাজিক প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
এ সময় পরিবর্তন–এর নির্বাহী পরিচালক বলেন,
“এত দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নে নাগরিক সমাজ, স্থানীয় জনগণ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। জনশুনানি ও স্বচ্ছ আলোচনার বাইরে গিয়ে এই পরিকল্পনা অনুমোদনের চেষ্টা পূর্ববর্তী সরকারের অস্বচ্ছ ও কেন্দ্রভিত্তিক নীতিনির্ধারণেরই ধারাবাহিকতা।”
বক্তারা বলেন, মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৫.৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫.২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা প্রায় ৫০ শতাংশে থাকবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তারা আরও অভিযোগ করেন, হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস)-এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাস্তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াবে।
বক্তাদের মতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ দাঁড়াবে ১৮৬.৩ MtCO₂e, যা দেশের এনডিসি লক্ষ্য এবং ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলেও তারা জানান।
প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ইপিএসএমপি ২০২৫ অবিলম্বে স্থগিত ও বাতিলের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ জাতীয় পরামর্শ আয়োজন, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং ন্যায্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলেন, এসব দাবি উপেক্ষা করা হলে খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি জনবিরোধী, অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নথিতে পরিণত হবে, যা দেশের জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

