বাড়িঅন্যান্যলোকগানের কিংবদন্তী শিল্পী হাজেরা বিবি স্মরণে

লোকগানের কিংবদন্তী শিল্পী হাজেরা বিবি স্মরণে

মোঃ মফিজুর রহমান , ভাটারা(ঢাকা)শিক্ষানবিশ প্রতিনিধি

তিনি শুধু লোকগানের জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন না। ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের  এক অক্লান্ত পরিব্রাজক ও কৃতি সাধিকা ।  তার সংগীত জীবনের সাফল্যগাথা  কলমের আঁচড়ে হয়তো কাগজের বুকে এঁকে দেয়া যায়। কিন্তু তাঁর আধ্যাত্ম সাধনার নিরন্তর অন্তরজ্বালা ও ক্রমাগত দহন, সমাজের কাছ থেকে পাওয়া উপেক্ষা অবজ্ঞা, ভ্র-কুঞ্চন আর রক্তচক্ষুর  আস্ফালনজাত বিষাদ ও ক্লান্তির কড়চা যর্থার্থভাবে পরিস্ফুটনের শক্তি আমার  কলমে নেই । 
মানবজীবনতো শুধুই  ক্রমাগত ক্লেশ  আর ক্ষরণের নয়। হাজেরা বিবিও একদিন জয় করেন জীবন ও সমাজের সমূহ উষ্মা ধারাবাহিক বিরূপতা ।  
১৯৬০ সালে ফতেহ লোহানী পরিচালিত   ‘ আসিয়া ‘ চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন তিনি । এর আগে রেডিও পাকিস্তান, পিটিভি,  স্বাধীনতার পরে রেডিও বাংলাদেশ , বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভি-র  নিয়মিত  শিল্পী  ছিলেন । তবে তাঁর বেশি জনপ্রিয়তা ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে  পালাগান, বিচারগান, জারী ও মুর্শীদা গানের শিল্পী  হিসেবে ।
হাজেরার প্রকৃত নাম ছিল ননীবালা। বাবা রাজকুমার ছিলেন পেশায় কাঠমিস্ত্রি । মা শ্যামাদাসী করতেন পুরোপুরি ঘরসংসারী।  তাদের কয়েকটি সন্তান হয়ে মারা গেলে পরে ননীবালা ( হাজেরা) র  জন্ম হলে  মানত অনুযায়ী কোলে কোলে বিয়ে দেন একই গ্রামের শিশু হিতিশের সাথে।
 খুবই অল্প বয়সে একটি ছেলে হলে নাম রাখেন মন্টু । মন্টুর জন্মের কিছু দিন পরেই  স্বামী হিতিশ মৃত্যু বরণ করেন। মন্টুও বেঁচে ছিল মাত্র ১১ মাস। এর কিছু দিন পরেই বাবা রাজকুমার, মা শ্যামাদাসীও পৃথিবী ছাড়েন। ফলে, সংসার নয় নিজের জীবনই  দুর্বিষহ হয়ে ওঠে নিজের কাছে ।
স্বামী সন্তান বাবা-মা হারিয়ে আশ্রয় নেন মামা বাড়ি ঈশান গোপালপুরে। এখানে সান্নিধ্য পান বনকু সাধুর। সাধু সনাতন ধর্মের অনেক তথ্য ও তত্ত্বকথা শিখিয়েছিলেন ননীবালাকে। যা পরবর্তীকালে বিচার গানে তুলে এনেছেন তিনি। 
এমনই এক গানের অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় কবি জসীম উদদীন এর সাথে। কবি তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন। ননীবালা কবিকে  বাবা বলে সম্বোধন করেন। তাঁর কন্ঠে কবি বিচার গানের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। নিঃসঙ্গ জীবনে পথের অবসান ঘটাতে কবি পেশা হিসেবে গানকে বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করেন  তাকে। 
ননীবালার এভিডেভিড করে নাম রাখা হয়  হাজেরা। কবির নিজের ধর্মপুত্র আজাহার মন্ডলের  সাথে বিয়ে দেন তাকে। আজাহার মন্ডলেরও ছিল গান-বাজনা পেশা । শুরু হয় হাজেরা বিবি নামে এক গায়িকার  নতুন জীবন সতীনের সংসারে। 
লোকগানের শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ  করেন হাজেরা। কবি জসীম উদদীন তাঁকে অলইন্ডিয়া রেডিওতে গান গাইবার ব্যবস্থা করে দেন। ঢাকার রমনাপার্কের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তাকে দিয়ে গান গাইয়েছিলেন।  
গান গাইবার অপরাধে হাজেরাকে এক ঘরে  করা হয়েছিল গ্রাম্য শালিসিতে। আগে হিন্দু ছিল সে অভিযোগে ‘৭১ সালে তাঁর বাড়ি  আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ।  স্বামী অজানা রোগে অন্ধত্ব বরণ করে ও মারা যায় । অসহায় হাজেরা গানের দলের  দোহার মনিরুদ্দিন ফকিরের আশ্রয় নেন । গ্রামের মানুষ তাদের বিয়ে দিয়ে দেন। এ স্বামীও  অন্ধ হয়ে রোগে ভুগে মৃত্যু বরণ করেন। 
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দুঃখ কষ্ট অভাব অভিযোগে হিমসিম খেতে থাকেন। কন্ঠ ভেঙে গিয়েছিল। গান গাওয়া  বন্ধ হয়ে যায় । 
হাজেরা বিবি সারাজীবন লোকসংস্কৃতির  মাধ্যমে  মানুষের সেবা ও আনন্দ দিলেও  তাঁর ব্যক্তি জীবন ছিল ভাঙা-গড়া  বিরহ-বিচ্ছেদ দুঃখ কষ্টে ভরা। তাকে দেখতে চিত্র শিল্পী আনোয়ার হোসেন , পরিচালক খান আতাউর রহমান,  সুরকার আজাদ রহমান, নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এসেছেন ফরিদপুরে। 
২০০৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর লোক গানের  কিংবদন্তি শিল্পী হাজেরা পৃথিবী ছেড়েছেন  শতবছর বয়সে ।
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments