বাড়িবাংলাদেশেচট্টগ্রাম বিভাগলংমার্চে বাধা দেয়নি সরকার, রাজনীতিতে নতুন বার্তা

লংমার্চে বাধা দেয়নি সরকার, রাজনীতিতে নতুন বার্তা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

বিএনপি সরকারের মাত্র ছয় মাসের মাথায় নানা দাবি নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করেছে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। যদিও তাদের উত্থাপিত দাবিগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। কর্মসূচির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক যানজট ও জনভোগান্তির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খলাও। এরপরও বিরোধী জোটটির কর্মসূচিতে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধা দেয়নি সরকার।

মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাদের কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শনের মাধ্যমে রাজনীতির গুণগত মানোন্নয়নের একটি নতুন বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন সরকার।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ১১ দলীয় জোটের লংমার্চে বাধা না দিয়ে সরকার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির এমন ইতিবাচক ভূমিকার জন্য তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান।

সরকারি কর্মকমিশনের সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপি যে শ্রদ্ধাশীল, এটি তারই প্রমাণ। যদিও বিগত ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। বিএনপির বিভিন্ন লংমার্চ, রোডমার্চ, সভা-সমাবেশ ও আন্দোলন কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বাধা দিয়েছে, হামলা চালিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচি পণ্ড করে দিয়েছে। শুধু মহাসড়ক নয়, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও দাঁড়াতে দেয়নি তারা।

এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতিচর্চার দুই বছরের মাথায় গত শনিবার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ করে ১১ দলীয় ঐক্য।

শুরুতেই ‘চূড়ান্ত’ পর্যায়ের কর্মসূচি! : যদিও সব দাবির মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই দুটি বিষয় বাস্তবায়ন করবে বলে বারবার আশ্বাসও দিচ্ছেন। বাকি দাবিগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সৃষ্ট। এ সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করেছে।

নতুন সরকারকে সময় না দিয়ে কর্মসূচির শুরুতেই লংমার্চের মতো ‘চূড়ান্ত’ পর্যায়ের কর্মসূচি দেওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন সচেতন মহল। ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া লংমার্চটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করেন জোটের নেতারা। কর্মসূচির কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যানজট ও জনভোগান্তি তৈরি হয়। কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়। লংমার্চের আগে জোটের নেতারা সরকারকে কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সরকারও তাদের যাত্রাপথে কোনো রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। তারা পথসভা করেছে, সরকারের সমালোচনা করেছে এবং নির্ধারিত সমাপনী কর্মসূচিও পালন করেছে। অর্থাৎ দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন, জনভোগান্তি কিংবা বিশৃঙ্খলা- কোনোটিকেই রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেনি সরকার।

অতীতের সঙ্গে পার্থক্য : বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা ও হামলার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বাধা ও হামলার বহু ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৮ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে বিএনপির লংমার্চ কাঁচপুরে আটকে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’, ২০২৩ সালের ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি এবং ২০২৪ সালের কালো পতাকা মিছিলেও বিএনপিকে বাধা দেওয়া হয়। বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর গুলিবর্ষণসহ নানাভাবে হামলাও চালানো হয়। সেই অভিজ্ঞতার বিপরীতে ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিরোধী ১১ দলের লংমার্চ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সম্পূর্ণ বাধাহীনভাবে যেতে দেওয়া হয়েছে। ছয় মাস না যেতেই নতুন সরকারের বিরুদ্ধে অশোভন বক্তব্য, দাবি ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির কর্মসূচি হওয়া সত্ত্বেও তা প্রশাসনিক বা দলীয় শক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে দেয়নি বিএনপি সরকার।

রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতির বার্তা : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলের কর্মসূচির বিপরীতে প্রশাসনিক বাধা, পাল্টা কর্মসূচি ও দলীয় শক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি দেখা গেছে। এবার ১১ দলের লংমার্চে সেই পুরোনো চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও চলাচলের অধিকার রক্ষার দায়িত্বও রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে। ১১ দলের লংমার্চে যানজট, জনভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় সেই দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারপরও সরকার কর্মসূচি বন্ধ করেনি। বিরোধী জোট সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে, এমন দাবি তুলেছে যেগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতেও পড়েছে-কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ তাদের দেওয়া হয়েছে। অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি কর্মসূচি দিয়েই অবশ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্থায়ী পরিবর্তন বিচার করা যাবে না। ভবিষ্যতে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও অন্যান্য কর্মসূচিতেও একই সহনশীলতা বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। একইভাবে বিরোধী দলগুলোকেও কর্মসূচির নামে জনভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চ অন্তত একটি বার্তা দিয়েছে-রাজনৈতিক বিরোধিতার জবাব বাধা বা হামলা দিয়েই দিতে হবে, এমন নয়। সরকার বিরোধী দলের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ দিতে পারে। এই চর্চা অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও সহনশীল সংস্কৃতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments