
অংবাচিং মারমা । রুমা,বান্দরবান প্রতিনিধি:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়া বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমা উপজেলা। এখানে ম্রো, বম, খুমি, লুসাই, মারমা,ত্রিপুরা,তংচঙ্গ্যা ও খ্যাংসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ বসবাস। তবে প্রকৃতির নৈসর্গিক দৃশ্যপটের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—চরম অবহেলা ও বঞ্চনার কাহিনি।
রুমার অধিকাংশ দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম এখনো বিদ্যুৎবিহীন। নিরাপদ পানি ও চলাচলের উপযুক্ত সড়ক নেই। বর্ষা মৌসুমে সড়কপথ একপ্রকার অচল হয়ে পড়ে, ফলে খাদ্য, ওষুধ ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ হয়ে পড়ে অসম্ভব। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষ উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হন—শুধুমাত্র বাজারে পণ্য পৌঁছাতে না পারার কারণে।
রুমার শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র আরও করুণ। অনেক পাহাড়ি গ্রামে এখনো কোনো বিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। যেগুলো আছে, সেগুলোতেও প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক সংকট,মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যবইয়ের অভাব এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা শিক্ষার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়া তো দূরের কথা,অনেকেই জানেই না প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার কী। পাহাড়ি পথের দূরত্ব,পারিবারিক শ্রমচাহিদা ও আর্থিক অসচ্ছলতা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী হতে বাধা দিচ্ছে।
রুমা সদরের একমাত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কার্যত অচল। চিকিৎসক নেই বললেই চলে,ওষুধের সরবরাহ অপ্রতুল,নেই জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা। জটিল রোগ বা প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে রোগীদের বান্দরবান সদর কিংবা চট্টগ্রাম পাঠানো ছাড়া বিকল্প থাকে না—যা সময়সাপেক্ষ,ব্যয়বহুল এবং কখনো কখনো প্রাণঘাতীও হয়ে ওঠে। নারী ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও প্রকট।
রুমা সদর ইউনিয়নের বাসাদুই পাড়ার বাসিন্দারা জানান, পাশ দিয়ে প্রবাহিত সাংগু নদীর ভাঙনে পাড়ার ঘরবাড়ি একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ছোট পাড়া হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের তেমন নজরও নেই। স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাসাদুই পাড়া হয়তো নামেই থাকবে, বাস্তবে হয়তো হারিয়েই যাবে।”
স্থানীয়দের মতে,এই অব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হলে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক,টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ। জরুরি ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামো, উন্নত করতে হবে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ।
তারা স্পষ্টভাবে বলেন,“প্রতিশ্রুতি নয়, আমরা চাই কার্যকর পদক্ষেপ। পাহাড়ের মানুষ উন্নয়নের আলো থেকে আর বঞ্চিত থাকতে চায় না।
স্থানীয়রা আরো বলেন পায়ের হেঁটে কাদে নিয়ে কলা,আদা,হলুদ,কৃষিপণ্য ফসল ও শাকসবজি বিক্রি করতে রুমা বাজারে নিয়ে আসলেও বাজারে ব্যবসায়িরা সিন্ডিকেটের ন্যাজ্যমুল্য না পেয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়ে থাকে। কারন আবার পায়ের হেটে পাহাড়ি পথের নেওয়ার অসম্ভব হয়ে পরে।
সচেতন মহল মনে করেন,সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় ছাড়া রুমার মতো দুর্গম অঞ্চলের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। এবং নীতিনির্ধারকদের যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণের—যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত, বিশেষ করে পাহাড়ি জনপদগুলো,জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে।

