
উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খাইরুল হক স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি নাম। রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলই কি তার রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি—এ প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে বিএনপির বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ঘটনায়। অনুসন্ধানে তার রাজনৈতিক যোগাযোগ, বিতর্কিত সম্পর্ক এবং পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার একাধিক দিক উঠে এসেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, খাইরুল হকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটি ধারাবাহিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলা। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও যোগাযোগে পরিবর্তন এসেছে বলেও দাবি করেন অনেকে।
একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তিনি আদর্শের রাজনীতি না করে বাস্তবতার রাজনীতি করেছেন। এতে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খাইরুল হকের সঙ্গে দলটির প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল—এমন আলোচনা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। সে সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা কর্মসূচিতে তার সক্রিয় উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
যদিও এ বিষয়ে খাইরুল হকের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে ওই সময় তার রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়াকে সংশ্লিষ্ট সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের পর খাইরুল হক বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। শুরুতে তার অবস্থানকে স্বাগত জানানো হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অতীত ভূমিকা ও রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন ওঠে।
দলীয় সূত্র জানায়, এসব বিষয়সহ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়।
দীর্ঘ সময় বহিষ্কৃত থাকার পর সম্প্রতি বিএনপি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে। দলটির একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, “বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংগঠনিক প্রয়োজন ও মাঠপর্যায়ের হিসাব–নিকাশ বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।”
তবে এ সিদ্ধান্তে দলের তৃণমূল পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে
রত্নাপালং ও আশপাশের এলাকায় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী মনে করছেন, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আগে তার অতীত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন ছিল। আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতিতে বাস্তবতার জায়গা থেকেই এ সিদ্ধান্ত।
একজন তৃণমূল কর্মী বলেন, “দল শক্তিশালী করার জন্য সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু আদর্শের প্রশ্নও থেকে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খাইরুল হকের ঘটনা একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইস্যুর চেয়েও বড়। এটি স্থানীয় রাজনীতিতে আদর্শ, সুযোগসন্ধানী কৌশল এবং দলীয় রাজনীতির বাস্তবতার সংঘাতকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামনে জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে খাইরুল হকের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা।
সব মিলিয়ে, রত্নাপালং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খাইরুল হকের রাজনৈতিক যাত্রা স্থানীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক, দল পরিবর্তন এবং বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ঘটনাপ্রবাহ উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলেই ধারণা রাজনৈতিক মহলের।

