
মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া শহরে যেন নীরব এক আর্তনাদ ভাসছে—অসহায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সবজি বিক্রেতাদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে বাজারের বাতাস। কথিত “শহর উন্নয়ন কমিটি”-র বিরুদ্ধে উঠেছে কাঁচা বাজার থেকে চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, একই বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতিদিন তিন দফায় টাকা নেওয়া হচ্ছে—ইজারাদার নিচ্ছেন ৮০ টাকা, শহর উন্নয়ন কমিটি ৩০ টাকা এবং কথিত বাজার কমিটি ২০ টাকা। এই অতিরিক্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ ক্রেতার কাঁধে; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে যুক্ত হচ্ছে অদৃশ্য এক ‘চাঁদার হিসাব’, ফলে বাজারে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিরতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সবজি বিক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের তিন দফায় চাঁদা দিতে হচ্ছে। প্রতিদিনের আয়ের বড় অংশ এভাবেই চলে যায়। বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করছি, নইলে টিকে থাকা কঠিন।” তার কণ্ঠে ছিল ভয় আর হতাশার মিশ্রণ—বাজারে জায়গা ধরে রাখা এবং হয়রানি এড়াতেই অনেকে নীরবে মাথা নত করছেন। অথচ লোহাগাড়া বটতলী শহরে পাঁচ হাজারেরও বেশি স্থায়ী দোকান এবং অসংখ্য ভাসমান দোকান রয়েছে। স্থায়ী দোকান থেকে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার নামে অর্থ নেওয়া হলেও, ভাসমান দোকানিরা প্রতিদিন ইজারাদারকে টাকা দিয়েই ব্যবসা চালান—তাদের ওপর আবার বাড়তি চাঁদার চাপ কেন, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
সচেতন মহল জানতে চাইছে—এই কমিটির বৈধতা কোথায়? কারা এর নিয়ন্ত্রক? কোন রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ছত্রছায়ায় এটি পরিচালিত হচ্ছে? বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে বাজার মনিটরিং জোরদার না হওয়ায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। দাম বাড়ছে, কিন্তু কার্যকর নজরদারি নেই—এমন অভিযোগে ক্রেতাদের হতাশা স্পষ্ট।
এ বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছেন মুসলিম হোসাইন। নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, লোহাগাড়ায় অসহায় ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের কাছ থেকে একাধিকবার চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। তিনি বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে বিশেষ কেউ হতে হয় না—প্রয়োজন শুধু সৎ সাহস। বাজারে তিন দফা চাঁদার কারণে বিক্রেতারা বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কথিত এই কমিটির বৈধতা ও নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, এবং রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি রমজানে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “অনির্বাচিত কোনো কমিটির কোনো বৈধতা নেই এবং চাঁদা সংগ্রহ সম্পূর্ণ অবৈধ। আমি বিষয়টি আগেও স্পষ্ট করেছি।” তিনি প্রশাসনকে অভিযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অনিয়ম বাড়তেই পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং প্রশাসনিক দৃঢ়তা—এই তিনটি স্তম্ভই পারে বাজারে ন্যায্যমূল্য ফিরিয়ে আনতে। অন্যথায় চাঁদার অদৃশ্য ছায়া ক্রমেই দীর্ঘতর হবে, আর তার ভার বইবে সাধারণ মানুষই।

