
আমদানি-রপ্তানির ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলয়ায় প্রস্তুত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। আগামী দেড় দশকে কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বর্তমানের আড়াই গুণ বাড়াতে চায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এজন্য নেওয়া হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি এবং ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় ২০৪০ সালের মধ্যে বার্ষিক ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন বা ৮৭ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনটি মেগা প্রকল্প বে-টার্মিনাল, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এই বিশাল সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হবে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। তবে এক লাফে সক্ষমতা না বাড়িয়ে তিন ধাপে অর্থাৎ ২০৩০, ২০৩৫ এবং ২০৪০ সালে পর্যায়ক্রমে লক্ষ্য অর্জনে এগোচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এ বন্দর দিয়ে সমুদ্রকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশই হয়ে থাকে।
এজন্য এ বন্দরকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। প্রায় প্রতি বছর পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় দীর্ঘ সময় বন্দরের অবকাঠামো বাড়েনি। তাই পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতাও বেড়েছে ধীরগতিতে।
২০০৭ সালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হয়। এর দীর্ঘদিন পর নির্মাণ করা হয় আরেকটি টার্মিনাল পতেঙ্গা কনটেইনার (টার্মিনাল)। বর্তমানে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ের সঙ্গে এ টার্মিনাল পরিচালনায় চুক্তি হয় ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর। টার্মিনালটিতে বছরে সাড়ে চার লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব। গত বছর (২০২৫) চট্টগ্রাম বন্দর সব মিলিয়ে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছিল।
যা আগের বছর ছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউএস। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান যে অবকাঠামো রয়েছে, তা দিয়ে ভবিষ্যতে আমদানি-রপ্তানির চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। আর এ কারণে নতুন অবকাঠামো তৈরির বিকল্প নেই।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ১৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এর মধ্যে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী টার্মিনালে ২০৩০ সালে অপারেশন শুরু হতে পারে। লালদিয়ায় দশমিক ৮০ মিলিয়ন এবং মাতারবাড়ীতে এক মিলিয়ন অর্থাৎ দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে ১ দশমিক ৮০ মিলিয়ন বা ১৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রাথমিক পর্যায়ে ২০৩০ সালেই বাড়বে। এদিকে বন্দরের ইতিহাসে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রকল্প বে-টার্মিনাল চালু হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ ৩ দশমিক ৬০ মিলিয়ন বা ৩৬ লাখ টিইইউএস যুক্ত হবে। কনটেইনারের পাশাপাশি কর্গো হ্যান্ডলিং ২০২৪ সাল নাগাদ ৩০৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে ২০৪০ সালের মধ্যে বন্দরের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করে বর্তমান সক্ষমতাকে ৮৭ লাখ টিইইউএস-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
লালদিয়া টার্মিনাল : চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়ার চরে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ গত ৩০ আগস্ট শুরু হয়েছে। এটি নির্মাণ ও পরিচালনা করবে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আওতায় টার্মিনালটি ২০৩০ সালে চালু হওয়ার কথা। একটানা ৩০ বছর এটি পরিচালনা করবে এপিএম। অবশ্য মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখানে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে। টার্মিনালটি পুরোদমে চালু হলে ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর : কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে চলছে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কর্মযজ্ঞ। এখানে প্রায় ১৬ মিটার গভীরতার নৌ-চ্যানেল এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে আসা জাহাজের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ সরাসরি বার্থিং নিতে পারবে। বন্দরটি দেশের বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বে-টার্মিনাল : চট্টগ্রামের পতেঙ্গা-হালিশহর সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে বে-টার্মিনালের অবস্থান। এটাকে বলা হচ্ছে আগামীর বন্দর। অর্থাৎ ভবিষ্যতে বে-টার্মিনালই বন্দরের পণ্য পরিবহনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতার চেয়েও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে এখানে। ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে না বন্দরজেটিতে। তবে বে-টার্মিনালে বার্থিং নিতে পারবে এর চেয়েও বড় জাহাজ। এখানকার একটি টার্মিনালে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান।

